Contact us:
info@elawyerbd.com

সিকস্তি ও পয়োস্তি

সিকস্তি (Diluvion) ও পয়োস্তি (Aluvial)

সিকস্তি শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো ভাঙ্গা৷ যদি কোনো জমি/ভূমি ভেঙ্গে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় তবে তাকে সিকস্তি বলে ।

পয়োস্তি শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো সংযুক্ত বা একত্রিভূত হওয়া যাকে আইনী ভাষায় পয়োস্তি বলে । কোনো জমি সাগর বা নদীর গতিপথের পরিবর্তনের কারণে কিংবা নদীর পানি সরে যাওয়ার ফলে জেগে উঠলে অথবা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া জমি পুনরায় ভেসে উঠলে তাকে পয়োস্তি বলা হয় । {১৮২৫ সালের বেঙ্গল এলুভিয়ন ও ডিলুভিয়ন রেগুলেশন এর (৪ ধারা)}৷

তবে এই পয়োস্তি বা জেগে ওঠা জমি দুই ধরনের হতে পারে  ।

(ক) ভেঙ্গে যাওয়া জমি পুনরায় জেগে ওঠা এবং

(খ) নতুন কোনো জমি জেগে ওঠা ।

 

সিকস্তি ও পয়োস্তি সংক্রান্ত অধিকার

নদী গর্ভ থেকে জমি জেগে ওঠার পর অতিরিক্ত খাজনা প্রদান করে ঐ জমি ফেরত পাবার অধিকার ।

জমি নদী গর্ভে বিলীন হলে কর মওকুফের জন্য রাজস্ব কর্মকর্তার নিকট দরখাস্ত দাখিলের অধিকার ।

নদী ভাঙ্গার ফলে পরবর্তীতে জমি/চর জেগে উঠলে তার নকশা সম্বন্ধে নোটিশের মাধ্যমে জানার অধিকার ।

নদী গর্ভ থেকে জমি জেগে উঠলে পূর্বের মালিকের জমি ফেরত পাবার অধিকার ।

পয়োস্তি জমির জন্য খাজনা প্রদানের পর রশিদ পাবার অধিকার ।

অন্য কাগজ পত্র হারিয়ে গেলে খাজনার রশিদের মাধ্যমে মালিকানা দাবীর অধিকার । (১৯৫০ সালের স্টেট একুইজিশন এন্ড টেনান্সি এক্ট এর ৮৬ ধারা) ।

 

লংঘন

নদী গর্ভ থেকে ডুবে যাওয়া জমি জেগে ওঠার পর তা জমির মালিককে ফেরত প্রদান না করা ।

নদী গর্ভ থেকে ডুবে যাওয়া জমি জেগে ওঠার পর সেই জমির জন্য খাজনা মওকুফের জন্য আবেদন দাখিলের সুযোগ না দেওয়া।

নদী ভাঙ্গার ফলে পরবর্তীতে জমি/চর জেগে উঠলে তার নকশা জানতে না দেয়া।

পয়োস্তি জমির জন্য খাজনা প্রদানের পর রশিদ প্রদান না করা।

জমি সংক্রান্ত অন্যান্য কাগজ পত্র হারিয়ে গেলে খাজনার রশিদের মাধ্যমে মালিকানা দাবী করতে না দেওয়া।

 

প্রতিকার

উপজেলা ভুমি রাজস্ব অফিসারের নিকট লিখিত দরখাস্ত দাখিল করতে হবে ।

১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৮৬ ধারায় সিকস্তি জমির মালিকানা সম্পর্কে বলা হয়েছে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া জমি বিলীন হওয়ার ২০ বছরের মধ্যে পুনরায় ঐ একই স্থানে জেগে উঠলে পুরাতন মালিক জেগে ওঠা জমির মালিকানা ফেরত পাবেন তবে শর্ত হচ্ছে-

পুনরায় জেগে ওঠা জমি সনাক্ত করার উপযুক্ত হতে হবে

যদি মালিক খাজনা দেয়া বন্ধ না করেন

মালিকের মোট জমির পরিমাণ আইনে নির্দিষ্ট সিলিং অতিক্রম না করলে।

কিন্তু ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির এক আদেশ বলে উক্ত ৮৬ ধারার ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করেন যার মূল বক্তব্য হলো:

নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া জমিতে জমির মালিক সব অধিকার হারাবেন এবং জমির মালিককে আর খাজনা পরিশোধ করতে হবে না৷

পুনরায় জেগে ওঠা জমি সরকারের খাস জমি হিসাবে গণ্য হবে যা ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণ যোগ্য বলে বিবেচিত হবে৷

জমি বিতরনের ক্ষেত্রে মালিক অগ্রাধিকার পাবেন৷ তবে কোনো অবস্থাতেই তার মোট জমির পরিমাণ সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করবে না৷

    বিলীণ জমিটিকে প্রাকৃতিক ভাবেই জেগে উঠতে হবে৷

১৯৯১ সালে ৩নং অধ্যাদেশ দ্বারা সংশোধিত সিকস্তি বা বিলীন হয়ে যাওয়া জমি সংক্রান্ত বিধান বাতিল করে দিয়ে পাকিস্তান আমলের সাবেক ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের বিধানের মত প্রায় অনুরূপ বিধান করা হয়েছিল৷

তারপর উক্ত অধ্যাদেশ জারির দু মাস পরে ১৯৯১ সনের ২৫নং অধ্যাদেশ জারি করে উক্ত ৩নং অধ্যাদেশ রহিত করা হয় এবং উক্ত ৩নং অধ্যাদেশ এমন ভাবে রহিত বলে গন্য করা হয়েছিল যেন এটা কখনও প্রণয়ন ও জারি করা হয় নি৷

বর্তমানে বাংলাদেশে যেআইনটি প্রচলিত আছে

আইনগুলি বাতিল করে ১৯৯৪ সালের ১৩ইং জুলাই তারিখে ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশদ্বয় বাতিল করে তদস্থলে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব (সংশধন) আইন ১৯৯৪ দ্বারা ৮৬ ধারার ব্যাপক পরিবর্তন করেন৷

 

পরিবর্তন গুলি হলো

১৩ই জুলাই ১৯৯৪ সালের পর থেকে ভেঙ্গে যাওয়া বা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া জমি ৩০ বছরের মধ্যে জেগে উঠলে পূর্বের মালিক তথা ভেঙ্গে যাওয়ার আগের মালিক জমি ফেরত পাবেন, তবে যে মালিকদের জমি ৬০ বিঘা বা তার বেশী পরিমাণ জমি আছে তারা ভেঙ্গে যাওয়া জমি ফেরত পাবে না৷ তবে ৬০ বিঘার কম জমি থাকলে ৬০ বিঘা পূরণ করতে যতটুকু জমির প্রয়োজন ততটুকু জমি ফেরত পাবেন এবং ৬০ বিঘা জমি পূরন করে যদি কোন জমি অবশিষ্ট থাকে তাহলে তা খাস জমি হিসাবে গণ্য হবে ।

    কোন জোতের জমি বা অংশ বিশেষ নদীতে ভেগে গেলে ভেঙ্গে যাওয়া অংশের জন্য মালিককে খাজনা দিতে হবে না ।  রাজস্ব অফিসার জমি ভেঙ্গে যাওয়ার ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর মালিককে একটি খাজনার রশিদ প্রদান করবেন ।

    নিমজ্জিত জমি পুনরায় জেগে উঠলে এই রশিদটি পয়েস্তি বা বৃদ্ধি প্রাপ্ত জমির মালিকানা নির্ণয়ের প্রমাণ হিসাবে গণ্য হবে ।

    কালেক্টর সর্ব প্রথম জেগে ওঠা জমির দখল নিয়ে নিবেন এবং জনগণকে জেগে ওঠা জমির ব্যাপারে জানাবেন এবং নোটিশ প্রদানের মাধ্যে ন কশা তৈরী করাবেন ।

    উক্ত জেগে ওঠা জমির নকশা/ ম্যাপ তৈরী হওয়ার পর ৪৫ দিনের মধ্যে কালেক্টর মূল মালিক বা তার আইনগত উত্তরাধিকারীগণের নিকট হস্তান্তর করবেন৷ তবে উক্ত হস্তান্তর জমির পরিমাণ মালিক প্রতি ৬০ বিঘার বেশি হবে না ।

    এই হস্তান্তরিত জমির জন্য কোন জমির মালিক বা মালিকের বৈধ উত্তরাধিকারীদেরকে কোন সেলামী দিতে হয় না তবে গ্রহীতাকে আইনানুযায়ী ধায্যᐂন্যায্য খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে হবে ।

    যদি উক্ত বিলীন হয়ে যাওয়া জমি প্রাকৃতিক উপায়ে জেগে না ওঠে তাহলে জমির মালিক উক্ত জমির দাবী করতে পারবে না ।

    কালেক্টর কর্তৃক জেগে ওঠা জমি দখল নিয়ে পাবলিক নোটিশ প্রদানের ১ বছরের মধ্যে জেগে ওঠা জমি নিয়ে কোন আদালতে মামলা দায়ের করা যাবে না৷ {১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৮৬(এ) ধারা}

(যদিও ২০০৪ সালের ১০ই মার্চ তারিখে The state Acquisition and Tenancy Act 1950 (The Act No. XXVIII of 1995) এ সংশোধনী নিয়ে আসা হয়েছে কিন্তু উক্ত আইনের ৮৬ ধারার নতুন করে কোন সংশোধনী হয়নি বিধায় ১৯৯৪ সালের ১৩ই জুলাই এর সংশোধনীই বলবত্ ‌আছে । )

 

জমি সিকস্তি অথবা পয়স্তি হলে যা করণীয়

১৯৯৪ সালের ১৩ই জুলাই তারিখে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন করে ৮৬ ধারায় বলা হয়েছে যে,

৮৬ (১) ধারায় কোন ব্যক্তির জমি সিকস্তি বা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার সংগে সংগে জমির মালিক ভূমি উন্নয়ন কর মওকুফের জন্য নির্ধারিত ফরমে রাজস্ব অফিসারে নিকট আবেদন করতে হবে৷ উক্ত আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় তদন্ত শেষে রাজস্ব অফিসার বা সহকারী কমিশনার ( ভূমি ) ভূমি উন্নয়ন কর মওকুফের অদেশ দিবেন৷ এরূপ দরখাস্তই পরবর্তীতে জমির স্বত্ত্বের প্রমাণ হিসাবে গণ্য হবে ।

(২) উক্ত সিকস্তি বা নদী গর্ভে জমি বিলীন হয়ে যাওয়ার পর ৩০ বছরের মধ্যে জমি জেগে উঠলে বা পয়স্তি হলে জমির মালিক বা মালিকের উত্তরাধিকারীগণ জমি দাবী করতে পারবে।

(৩) উক্তরূপ জমির প্রাপ্তির জন্য গ্রহীতাকে কোন সেলামী বা কোনো টাকা পয়সা দিতে হবে না তবে তাকে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে হবে ।

 

নদী বা সাগর সরে যাওয়ার ফলে কোন বিলীন হওয়া জমি জেগে ওঠে সেই জমির অধিকার সংক্রান্ত বিধানঃ

১৯৫০ সালের স্টেট একুইজিশন এন্ড টেনান্সি এক্ট এর ৮৭ ধারায় নদী বা সাগর সরে যাওয়ার ফলে যদি কোনো জমি জেগে ওঠে তাহলে জমির পূর্বের মালিক সেই জেগে ওঠা জমির মালিকানা দাবী করতে পারবে না কারণ উক্ত জমি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের হাতে অর্পিত হবে এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে ।

এই ধারার ৩ উপধারায় বলা হয়েছে সাগর বা নদী সরে যাওয়ার দরুণ কোনো জমি জেগে উঠলে বা জেগে উঠেছে এমন জমির জন্য ১৯৭২ সালের প্রেসিডেন্টের আদেশ নং ১৩৭ বলবত্‌ হওয়ার পুর্বে যদি কোনো ব্যক্তি দাবী করে কোনো আদালতে মামলা থাকে তাহলে অত্র প্রেসিডেন্টের আদেশ বলবত্‌ হওয়ার পর থেকে উক্ত দাবীকৃত মামলার কোনোরূপ কার্যক্রম আর চলবে না । এমনকি অত্র প্রেসিডেন্ট আদেশ বলবত্‌ হওয়ার পর সাগর বা নদী সরে যাওয়ার ফলে জেগে ওঠা জমি নিয়ে আর নতুন করে কোনো আদালতে মামলা করা যাবে না ।

Leave a comment