Contact us:
info@elawyerbd.com

জমি রেজিস্ট্রেশন

জমি রেজিস্ট্রেশন করা কি জরুরি ?

বাংলাদেশে অনেক মানুষই ভূমি আইন সম্পর্কে খুব বেশি জানেন না। ফলে তারা জমি নিয়ে নানা ধরনের প্রতারণা ও হয়রানির শিকার হন । জমি রেজিস্ট্রেশন করা খুবই জরুরি ।

১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী, কোন জমি বা ভূখন্ড হস্তান্তর করতে হলে বা মালিকানা পরিবর্তন করতে হলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নির্ধারিত ফরমে ক্রেতা-বিক্রেতার চাহিদা মাফিক তথ্যাবলী ও দলিলাদি উল্লেখ করে যে নিবন্ধন করা হয় এবং যাতে জমির পরিচিতি উল্লেখ থাকে যা দলিলে লেখা হয়, এ ধরণের দলিল সাব-রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নিবন্ধিত করাকে রেজিস্ট্রি বলে। যে ক্ষেত্রে দলিল দাতা অথবা গ্রহীতা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যেতে পারেন না সে ক্ষেত্রে যে কোন পক্ষের চাহিদা মোতাবেক সাব-রেজিস্ট্রার কমিশনের মাধ্যমে দলিল রেজিস্ট্রি করতে পারেন।

 

জমি রেজিস্ট্রেশন করা কি বাধ্যতামূলক ?

রেজিস্ট্রেশন আইন ২০০৪ (সংশোধিত) অনুযায়ী, সকল দলিল রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক। আইন অনুযায়ী দলিল রেজিস্ট্রি করা হলে মালিকানা নিয়ে বিরোধ এড়ানো যায়। এছাড়া জমি রেজিস্ট্রি করা থাকলে পরবর্তীতে বিক্রি, দান, উইল করতে সহজ হয়। স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয় দলিল অবশ্যই লিখিত হতে হবে।

 

রেজিস্ট্রেশন করার জন্য কি কি প্রয়োজন হয় ?

    জমি রেজিস্ট্রি করতে বিক্রিত জমির পূর্ণ বিবরণ উল্লেখ থাকতে হবে।

    দলিলে দাতা-গ্রহীতার পিতা-মাতার নাম, পূর্ণ ঠিকানা এবং সাম্প্রতিক ছবি সংযুক্ত করতে হবে।

    যিনি জমি বিক্রয় করবেন তার নামে অবশ্যই নামজারী (মিউটেশন) থাকতে হবে (উত্তরাধিকার ছাড়া)।

    বিগত ২৫ বছরের মালিকানা সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও সম্পত্তি প্রাপ্তির ধারাবাহিক ইতিহাস লেখা থাকতে হবে।

    সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য, সম্পত্তির চারদিকের সীমানা, নকশা দলিলে থাকতে হবে।

    দাতা কর্তৃক বিক্রিত সম্পত্তি অন্য কারো কাছে বিক্রি করেনি মর্মে হলফনামা থাকতে হবে।

    জমির পর্চাসমূহে (সি.এস, এস. এ, আর.এস) মালিকানার ধারাবাহিকতা থাকতে হবে।

    বায়া দলিল (প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে) থাকতে হবে।

 

যে সকল দলিল রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক

    বিক্রয় দলিল অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হবে।

    জমি ক্রয় করার পূর্বেবায়না দলিল সম্পাদন করলে তা ৩০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রেশনের জন্য উপস্থাপনকরতে হবে। রেজিস্ট্রি ছাড়া বায়না দলিলের আইনগত মূল্য নেই।

    বায়না চুক্তি প্রবলের জন্য ফৌজদারি আদালতে প্রতারণার অভিযোগ এনে দন্ডবিধির ৪২০ ধারায় মামলা করা যায়।

    বায়না দলিল রেজিস্ট্রির তারিখ হতে ১ বছরের মধ্যে বিক্রয় দলিল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দাখিল করতে হবে।

    হেবা বা দানকৃত সম্পত্তির দলিলও রেজিস্ট্রি করতে হবে।

    বন্ধককৃত জমির দলিল রেজিস্ট্রি করতে হবে।

    কোন ভূমি সম্পত্তিমালিকের মৃত্যু হলে তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে তার রেখে যাওয়া সম্পত্তিবাটোয়ারা করা এবং উক্ত বাটোয়ারা বা আপোষ বণ্টন নামা রেজিস্ট্রি করতে হবে।

 

যে সকল দলিল রেজিস্ট্রেশনের জন্য বাধ্যতামূলক নয়

যদিও ১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন এক্টে বলা হয়েছে যে উইল ব্যতীত সকল দলিল সম্পাদনের তারিখ হতে ৪ মাসের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক তথাপিও কিছু কিছু দলিল রেজিস্ট্রির জন্য বাধ্যতামূলক নয় সেগুলি হলো-

    কোন রাজস্ব আদালতের বাটোয়ারা কার্যক্রমে পক্ষগণ কর্তৃক কোন সোলেনামা সম্পাদিত হয়ে থাকলে এবং উক্ত সোলেনামা যদি আদালত কর্তৃক গৃহীত হয়ে থাকে।

    যদি কোন সম্পত্তি ভোগ করার জন্য অন্য কারো অধিকার সংকোচন বা কমানো বা ধ্বংস না করা হয় এবং তা যদি পারস্পরিক ও পারিবারিকভাবে নামান্তর করণের মত কার্যক্রমে সোলেনামা করা হয় তাহলে তা রেজিস্ট্রেশনের প্রয়োজন নাই।

    কোন আদালতের ডিক্রি (Decree), রায় ( Judgement) বা আদেশ (Order)

    অতীতের স্বত্বের স্বীকৃতি দিয়ে প্রস্তুতকৃত পারিবারিক বন্দোবস্ত।

    দেওয়ানী আদালতের বা সার্টিফিকেট অফিসারের নিলামে হস্তান্তরকৃত সম্পত্তির বায়না নামা।

    ১০০ টাকার কম মূল্যমানের স্থাবর সম্পত্তির হস্তান্তর দলিল।

    পোষ্যপুত্র/পালক পূত্র গ্রহণ করার দলিল। (১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইনের ২৩ ধারা)

 

বিভিন্ন প্রকার দলিল রেজিস্ট্রেশনের জন্য কি পরিমাণ ফিসের প্রয়োজন হয় ?

দলিল রেজিস্ট্রি করা হয় রেজিস্ট্রেশন আইন,স্ট্যাম্প আইন, আয়কর আইন, অর্থ আইন ও রাজস্ব সংক্রান্ত বিধি এবং পরিপত্রের আলোকে। সকল দলিলের রেজিস্ট্রি ফিস সমান নয়। সরকার বিভিন্ন সময় সমসাময়িক বিবেচনা অনুযায়ী রেজিস্ট্রি ফিস নির্ধারণ করে থাকেন।

 

রেজিস্ট্রেশন আইন (সংশোধিত ২০০৪)৭৮ এ অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ের বায়না দলিল ফিঃ

 

হেবা দলিলের রেজিস্ট্রি ফিঃ

    বিক্রয় যোগ্য সম্পত্তির বিক্রয় মূল্য ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে রেজিস্ট্রি ফি হবে ৫০০ টাকা ।

    বিক্রয় যোগ্য সম্পত্তির বিক্রয় মূল্য ৫ লাখ টাকার বেশি এবং ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে রেজিস্ট্রি ফি হবে ১০০০ টাকা ।

    বিক্রয় যোগ্য সম্পত্তির বিক্রয় মূল্য ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে রেজিস্ট্রি ফি হবে ২০০০ টাকা ।

 

হেবা দলিলের রেজিস্ট্রি ফিঃ

মুসলিম পারসোনাল ল’ অনুযায়ী স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা, সন্তান, দাদা-দাদী, নাতি-নাতনী, সহোদরভাই-ভাই, সহোদরবোন-বোন, সহোদরভাই-বোনের মধ্যে হেবা বা দান দলিলের রেজিস্ট্রি ফি মাত্র ১০০ টাকা ।

 

বন্ধকী দলিল রেজিস্ট্রি ফিঃ

সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২ এর ৫৯ ধারা মতে বন্ধকী দলিলের রেজিস্ট্রেশন ফি হলো-

    বন্ধকী সম্পত্তির অর্থের পরিমাণ ৫ লাখ টাকার বেশি না হলে অর্থের ১%, তবে ২০০ টাকার কম নয় এবং ৫০০ টাকার বেশি নয় । যেমন: কোন সম্পত্তির পরিমাণ বিশ হাজার টাকা হলে ১% হিসেবে রেজিস্ট্রেশন ফি ২০০ টাকা, কিন্তু কোন সম্পত্তির পরিমাণ দশহাজার টাকা হলে ১% হিসেবে রেজিস্ট্রেশন ফি ১০০ টাকা। আইনে সর্ব নিম্ন ফি ২০০ টাকা হওয়ায় দশ হাজার টাকা পরিমাণের বন্ধকী জমির দলিল রেজিস্ট্রেশন ফি ২০০ টাকা- ইহবে (১০০ টাকা নয়)। একই ভাবে চার লক্ষ টাকা পরিমাণের জমির দলিল রেজিস্ট্রেশন ফি ১% হিসেবে ৪০০০ টাকা কিন্তু আসলে ফি দিতে হবে ৫০০টাকা কেন না আইনে সর্বোচ্চ ফি ধরা হয়েছে ৫০০ টাকা ।

     বন্ধকী সম্পত্তির অর্থের পরিমাণ ৫ লাখ টাকার বেশি এবং ২০ লাখ টাকার বেশি না হলে অর্থের ০.২৫%, তবে ১৫০০ টাকার কম নয় এবং ২০০০ টাকার বেশি নয় ।

    বন্ধকী সম্পত্তির অর্থের পরিমাণ ২০ লাখ টাকার বেশি হলে বন্ধকী অর্থের ০.১০% টাকা হারে, তবে ৩০০০ টাকার কম নয় এবং ৫০০০ টাকার বেশি হবে না ।

একথা মনে রাখতে রেজিস্ট্রেশন আইন ২০০৪ এর সংশোধন অনুযায়ী বন্ধকী সম্পত্তি গ্রহীতার লিখিত সম্মতি ছাড়া কোন বন্ধক দেয়া যাবে না এবং বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রি করা যাবে না ।

 

কবলা বন্ধকী দলিল রেজিস্ট্রি ফিঃ

    স্ট্যাম্প শুল্ক ক্রয় মূল্যের – ৫%

    রেজিস্ট্রি ফি ১-২৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রয় মূল্যের জন্য টাকা – ৫০/-

    রেজিস্ট্রি ফি ২৫০১-৪০০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রয় মূল্যের জন্য – ২%

    রেজিস্ট্রি ফি ৪০০১ হতে তদুর্ধ্ব বিক্রয় মূল্যের জন্য – ২.৫০%

     হলফনামা ফি টাকা – ৫০/-

    পৌর কর: সিটি কর্পোরেশন/ পৌর/টাউন/ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকার জন্য – ১%

    উৎসকর: সিটি কর্পোরেশন/ পৌর/টাউন/ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকার জন্য – ৫%।

     সিটিকর্পোরেশন/পৌর/টাউন/ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকা বর্হিভূত জমি বিক্রির ক্ষেত্রে জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ কর (১%+১%) – ২%।

    সিটি কর্পোরেশন/পৌর/টাউন/ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড বর্হিভূত এলাকার ১ লাখ টাকার অধিক মূল্যের অকৃষি জমি বিক্রির ক্ষেত্রে বিক্রেতার উৎস কর – ৫%।

    মওকুফ: সিটি কর্পোরেশন/পৌর/টাউন/ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকার বাইরের ১ লাখ টাকার নিচে অকৃষি জমি ও অন্যান্য কৃষি / ভিটি /নামা ইত্যাদি) জমি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে পৌরকর ও উৎস কর দিতে হবে না। কিন্তু জমি বিক্রির মূল্য ১ লাখ টাকার বেশি হলে, জমিটি অকৃষি হলে সে জমি পৌর এলাকার বাইরে হলেও তার জন্য ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে – ৫% ।

 

কর দেয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম

ভ্যাটও উৎস কর সব সময়ই জমির বিক্রেতা প্রদান করবে। আয়কর আইন মতে, এই দুই ধরণেরকর বিক্রেতার আয়ের ওপর ধার্য হয়। এই কর বিক্রেতার নামে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়। উৎস কর ও ভ্যাট ছাড়া অন্যান্য সকল ধরণের কর জমির ক্রেতাকে পরিশোধ করতে হবে।

 

জমি রেজিস্ট্রেশন কোথায় করা হয় ?

    প্রতিটি উপজেলায় সাব-রেজিস্ট্রি অফিস আছে । সেখানে জমি রেজিস্ট্রি করা হয়

 

জমি ক্রয় করলে যাচাই বাছাইয়ের জন্য কোথায় যেতে হবে?

    ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও উপজেলা ভূমি অফিসে বিক্রিত জমির তফসিল নিয়ে জমিটি আগে বিক্রি হয়েছে কিনা, আগে অন্য কারো নামে নামজারী আছে কিনা, বিক্রয়ে উল্লেখিত দাগ, খতিয়ান, নকশা ঠিক আছে কিনা এবং সর্বোপরি সরেজমিনে বিক্রিত জমি আছে কিনা তার খোঁজ পাওয়া যাবে। প্রয়োজনে ভূমি অফিস থেকে সার্ভেয়ার (আমিন) নিয়ে জমি মেপে জমি ক্রয় করতে হবে।

 

জমি বিক্রয় করতে জমি বিক্রেতার নামে নামজারী কি জরুরি?

    উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি ছাড়া সকল সম্পত্তি বিক্রয় করার ক্ষেত্রে দাতার নামে নামজারী বাধ্যতা মূলক ।

মৌখিক দান কি আইন সম্মত?

    ২০০৪ সালের রেজিস্ট্রেশনআইন সংশোধনের পর মৌখিক দান বৈধ নয়।

Leave a comment